প্লাস্টিক সার্জারি: শুধু চেহারা নয়, ফিরিয়ে দেয় স্বাভাবিক জীবনও

প্লাস্টিক সার্জারি: শুধু চেহারা নয়, ফিরিয়ে দেয় স্বাভাবিক জীবনও

ডা. সব্যসাচী বসুকনসালট্যান্ট, প্লাস্টিক অ্যাস্থেটিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি, নারায়ণা আর এন টেগোর হাসপাতাল, মুকুন্দপূর, কলকাতাপ্লাস্টিক সার্জারির কথা উঠলেই আমাদের মনে সাধারণত নাকের গঠন পরিবর্তন (রাইনোপ্লাস্টি), ফেসলিফট বা অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধক অস্ত্রোপচারের কথাই আসে। কিন্তু বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই বিশেষজ্ঞ শাখার পরিধি শুধুমাত্র সৌন্দর্য বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রমা কেয়ার, পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার এবং বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসার পর রোগীর পুনর্বাসনে প্লাস্টিক সার্জারির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।প্লাস্টিক সার্জারির মূল লক্ষ্য হলো শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা, তা ক্ষতির কারণ যাই হোক না কেন। আগুনে পোড়া, জন্মগত ত্রুটি, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত কিংবা অস্ত্রোপচারের পর সৃষ্ট শারীরিক পরিবর্তন – সব ক্ষেত্রেই পুনর্গঠনমূলক প্লাস্টিক সার্জারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে অনকোসার্জারি বা ক্যানসারজনিত অস্ত্রোপচারের সঙ্গে প্লাস্টিক সার্জারির সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও তা অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না।ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রেই জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়। যেমন স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে মাস্টেকটমি, মাথা ও গলার টিউমার অপসারণ, কিংবা ত্বকের ক্যানসার বা সারকোমা অপসারণের ফলে শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশের টিস্যু নষ্ট হতে পারে বা স্থায়ী বিকৃতি তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুনর্গঠনমূলক প্লাস্টিক সার্জারি শুধু একটি অতিরিক্ত বিকল্প নয়, বরং সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মাস্টেকটমির পর স্তন পুনর্গঠন। ইমপ্লান্ট, রোগীর নিজের শরীরের টিস্যু ব্যবহার করে করা ডিআইইপি (DIEP) বা ট্রাম (TRAM) ফ্ল্যাপ পদ্ধতি, অথবা এই দুটির সমন্বয়ের মাধ্যমে স্তনের গঠন পুনরায় তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে রোগী শুধু শারীরিক গঠনই ফিরে পান না, আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদাবোধও পুনরুদ্ধার করতে পারেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন পুনর্গঠন স্তন ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা নারীদের মানসিক সুস্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে।মাথা ও গলার ক্যানসারের ক্ষেত্রে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের গুরুত্ব আরও বেশি। টিউমার অপসারণের ফলে অনেক সময় রোগীর কথা বলা, খাওয়া বা শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। মাইক্রোভাসকুলার ফ্রি ফ্ল্যাপ সার্জারির মাধ্যমে শরীরের অন্য অংশ থেকে রক্তনালিসহ টিস্যু প্রতিস্থাপন করে চোয়াল, জিহ্বা বা মুখমণ্ডলের অন্যান্য অংশ পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়। এর ফলে রোগীর কার্যক্ষমতার পাশাপাশি স্বাভাবিক চেহারাও অনেকটাই ফিরিয়ে আনা যায়।তবে পুনর্গঠনমূলক প্লাস্টিক সার্জারির গুরুত্ব শুধু শারীরিক পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যানসারের কারণে শরীরের দৃশ্যমান পরিবর্তন অনেকের মধ্যেই হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার রোগীদের সেই মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে এবং নতুন করে আত্মবিশ্বাস অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবসে এই বিশেষজ্ঞ শাখার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করার এটাই উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসার সঙ্গে প্লাস্টিক সার্জারির এই সমন্বয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং রোগীর স্বাভাবিক জীবন, আত্মমর্যাদা এবং পূর্ণতা ফিরিয়ে দেওয়াও।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )