স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্টের উপস্থিতিতে জেগে থাকা অবস্থায় ব্রেন সার্জারি,এক বিরল দৃষ্টান্ত কলকাতায়।

স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্টের উপস্থিতিতে জেগে থাকা অবস্থায় ব্রেন সার্জারি,এক বিরল দৃষ্টান্ত কলকাতায়।

২৭ বছর বয়স,যে বয়সে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। ঠিক সেই সময়েই একদিন হঠাৎ খিঁচুনি। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সবকিছু। তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি। স্ক্যান রিপোর্টে ধরা পড়ে ভয়ংকর সত্য। মস্তিষ্কের গভীরে এমন একটি জায়গায় সমস্যা, যেখান থেকে মানুষের কথা বলা, মনে রাখা, কণ্ঠস্বর, খাবার গেলা, হাঁটা এমনকি গান গাওয়ার ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রিত হয়। এমন জায়গায় অপারেশন মানেই ছিল এক গভীর ভয়। কথা হারিয়ে ফেলার ভয়, নিজের পরিচয় হারানোর ভয়।

রোগ নির্ণয় ও স্নায়বিক পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নিউরোলজিস্ট ডা. দীপ দাস। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসক দল সিদ্ধান্ত নেন।এই অস্ত্রোপচার হবে জেগে থাকা অবস্থায়, অর্থাৎ রোগী অচেতন থাকবেন না। এই সাহসী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন কলকাতার সিএমআরআই হাসপাতাল–এর নিউরোসার্জন ডা. রথিজিৎ মিত্র। অ্যানেস্থেসিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন ডা. শৈলেশ কুমার।

কিন্তু এই অস্ত্রোপচারের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে মানবিক ভূমিকা পালন করেন স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট সমীর কুশালি। অপারেশনের অনেক আগেই তিনি রোগীর পাশে দাঁড়ান। খুব সহজ ভাষায় পরীক্ষা করেন রোগীর কথা বলা, স্মৃতি, কণ্ঠস্বর, যোগাযোগ আর খাবার গেলার ক্ষমতা। শুধু পরীক্ষা নয়,ভয় পাওয়া একজন মানুষকে তিনি সাহস দেন। বোঝান, “অপারেশনের সময় আপনার কথা বলা, আপনার সাড়া এইগুলিই আপনাকে আগের মতো করে রাখবে।”

অপারেশনের সময় সেই দৃশ্য ছিল সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা রোগী সম্পূর্ণ জেগে আছেন। তাঁকে কথা বলতে বলা হচ্ছে, শব্দ বলতে বলা হচ্ছে, ছোট বাক্য বানাতে বলা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে গান গাইতে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রতিক্রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট। কোথাও সামান্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পেলেই সঙ্গে সঙ্গে তা জানানো হচ্ছে নিউরোসার্জনকে। প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো হচ্ছে অস্ত্রোপচারের পথ। এই মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলিই রক্ষা করছে মানুষের কথা, স্মৃতি আর কণ্ঠস্বর। অস্ত্রোপচারের মাঝেই রোগী গান গেয়ে ওঠেন যা ছিল তাঁর কণ্ঠস্বর ও স্মৃতিশক্তি অক্ষুণ্ণ থাকার জীবন্ত প্রমাণ।

অপারেশনের পর ফলাফল ছিল আশ্চর্যরকম ভালো। কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তিনি অনায়াসে কথা বলছেন, স্মৃতি ঠিক আছে, খাবার গিলতে কোনো সমস্যা নেই, হাঁটাচলা স্বাভাবিক। এমনকি আগের মতোই গান গাইতে পারছেন।

চিকিৎসক দল জানালেন, উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের দলগত চিকিৎসা পদ্ধতি ধীরে ধীরে নিয়মিত হলেও আমাদের দেশে এখনও তা খুব বিরল। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিল ব্রেন সার্জারির সময় স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্টকে অপারেশন থিয়েটারের মূল দলে রাখলে শুধু জীবন নয়, জীবনের ভাষাটাও বাঁচানো যায়।

এই ঘটনা শুধু একটি সফল অস্ত্রোপচারের খবর নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আধুনিক চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখা। কথা বলা, গান গাওয়া, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার অধিকার এই অধিকার রক্ষার নীরব কিন্তু অপরিহার্য দায়িত্ব অনেক সময় অপারেশন টেবিলেই বহন করেন স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )